← Back to blogs
আফ্রিকার সফরনামা: ২য় পর্ব
Eng. Khandaker Marsus · Aug 18, 2026
সফরনামা আফ্রিকা: ২য় পর্ব....
পরের দিন আমরা চলে আসলাম জোবায়ের মসজিদে, লিবান ভাইয়ের বাসায়, বিল্ডিং এর নাম চায়না হাউজ। লিবান ভাই খুব ভালো মানুষ। যাই হোক, এই বাসার সামনে ও আশেপাশে অসংখ্য মদের বার। একদিকে যেমন তারাবির নামাজের সুমধুর আওয়াজ চলছে মসজিদে ও মসজিদের বাইরের লাউডস্পিকারে, ঠিক তেমনি বারগুলোতেও চলছে আসর। মুসলমানরা বারে যায় না, তবে খ্রিস্টানদের প্রধান কাজই এটা। এখানে মদের দাম পানির দামের মতো—১০০-১৫০ টাকায় এক বোতল মদ পাওয়া যায়। সাধারণ খ্রিস্টানরা, যাদের কোনো নামাজ-কালাম নেই, সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে মাগরিবের পর থেকে রাত ৮-৯টা পর্যন্ত এইসব জায়গায় কাটায়। তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এগুলো নিয়ে কারও কোনো মন্তব্য নেই। যে যার মতো নামাজ পড়ছে। মসজিদের বাইরের মাইকে অর্থাৎ আজানের লাউডস্পিকারে উচ্চস্বরে তারাবির নামাজ চলছে, কেউ কোনো মন্তব্য করছে না। আর এখানে সরকারিভাবে ফুল ফ্রিডম অফ রিলিজিয়ন—যে যার ধর্ম পালন করবে, কেউ বাধা দিতে পারবে না।
কেনিয়ার এক তাবলিগের সাথী ভাই বলছিল, "আপনি যদি চান, তবে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট রুটোকেও দাওয়াত দিতে পারবেন, কেউ বাধা দিবে না।" এমনকি আমাদের ওখানে এক এলাকায় এক ছেলে মুসলমান হওয়ায় বাবা ছেলেকে ধমক দিয়েছে। এই নিয়ে দুইজনেই থানায় গেছে। থানা থেকে ঐ বাবাকে বলে দিয়েছে, "আমাদের দেশে ফ্রিডম অফ রিলিজিয়ন। এরপর যদি এটা নিয়ে কোনো শব্দ হয়, তবে তোমাকে অ্যারেস্ট করা হবে।"
মসজিদগুলোর আরেকটা ভালো বৈশিষ্ট্য—প্রতিটি মসজিদে প্রচুর পরিমাণে বাচ্চারা আসে। তারা খেলাধুলা করে, আবার কোরআন নিয়ে বসে যায়। একদিন এমন একটি দৃশ্য খুব ভালো গেছে—একটি বাচ্চা, সম্ভবত ক্লাস ২-৩-এ পড়ে, কোরআন পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছে। তার বুকের ওপর কোরআন রেখে ঘুমিয়ে গেছে। ইচ্ছা হচ্ছিল একটা ছবি তুলি, কিন্তু ছবি তোলা পছন্দ না করায় আর তোলা হয়নি।
আমরা যেমন কোরআনকে অতি সম্মান দেখাতে গিয়ে গিলাফ পরিয়ে আলমারির উপরের তাকে রেখে দেই, গিলাফ খুলে পড়তেই ইচ্ছে হয় না—ভয় হয় অসম্মান হয়ে যাবে। কিন্তু পৃথিবীর অন্যান্য দেশের লোকেরা কোরআন পড়ে, তবে এই অতিরিক্ত সম্মান দেখায় না। কোরআনকে তারা যখন ইচ্ছে পড়ে, তাদের সাথে কোরআনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমাদের কোরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে গিলাফের। এই দৃশ্য আমি ভারতেও দেখেছি, অন্য কোনো দেশে এমনটি দেখিনি।
যাই হোক, তারাও ফুল ফ্রিডম নিয়ে যতই মসজিদের ভেতর খেলাধুলা করুক, কেউ তাদের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকায় না। একটি মসজিদে একবার টানা দুইদিন দেখলাম—৫-৬টি বাচ্চা একসাথে দাঁড়িয়ে আমিন বলার সময় এত জোরে আমিন বলছে যে আমরা অনেকটা চমকে উঠছি। মনে মনে ভাবছিলাম, আমার দেশে হলে ২-৪ জন পারলে নামাজ ছেড়ে দিয়ে হলেও ঐ বাচ্চাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিত। তবে এরা কিছুই বলল না। পরের দিনও একই অবস্থা। আমারই মনে হচ্ছিল, আমি কিছু একটা ভালো ভাষায় উপদেশ দেই। তখন মনে হলো, সমস্যা তো ঐ বাচ্চাদের না, যারা কিছু বলছে না তাদেরও না—বরং সমস্যা আমার। আমি চুপ হয়ে গেলাম এবং ধিক্কার দিলাম নিজেকে। এইজন্যই মনে হয় আমাদের দেশে মসজিদে বাচ্চাদের আনাগোনা এত কম। আমরা স্বাভাবিকভাবে মানুষকে উপদেশ দিতে পছন্দ করি।
উল্লেখ্য, শাফেয়ী, হাম্বলি ও মালেকি মাযহাবে সূরা ফাতিহার পরে সবাই জোরে আমিন বলে।
আমাদের দেশে কারও যদি ভুলে নামাজের মধ্যে মোবাইল বেজে উঠে, নামাজ শেষে সবাই তার দিকে শকুনের দৃষ্টিতে তাকায়—মনে হয় তাকে খেয়ে ফেলবে। আর তারও লজ্জায় এমন অবস্থা হয় যে পারলে এক সপ্তাহ মসজিদেই আসে না। আমাদের দেশ বাদে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই মানুষ অন্যকে নিয়ে এত চিন্তা করে না।
পরের দিন আমার খিদমত। এই দেশে মাছ একেবারে নেই বললেই চলে। কিছু থাকলেও অনেক দাম। আমাদের পুরো দুই মাসের সফরে মাছ চোখে দেখা হয়নি বললেই চলে। এখানে খাসির গোশত ৬০০-৭০০ টাকা, উটের গোশতও ৭০০ টাকা। গরুর গোশতও একই রকম। গরুর থেকে এই দেশে ছাগল ও উটই বেশি পাওয়া যায়। পুরো সফরে আমাদের সবচেয়ে বেশি খাওয়া হয়েছে উটের দুধ। কারণ কিছু এলাকায় গরুর দুধই পাওয়া যেত না।
যাই হোক, গোশত কিনতে বের হলাম। গোশতের দোকানকে এরা বুচারি বলে। শহরের বুচারিগুলোতে গোশত কাটার মেশিন থাকে। ছোট মেশিন অনেকটা স-মিলে কাঠ কাটার মেশিনের মতো। এত সুন্দর করে গোশত-হাড্ডি সব পিস পিস হয়ে যায়। আমাদের দেশে হাড্ডি কাটার জন্য যে চাপাতির যুদ্ধ চলে, এই মেশিন থাকলে আর যুদ্ধ করতে হয় না। মেশিনে গোশত কাটছে না হাড্ডি কাটছে বোঝা যায় না।
যাই হোক, গোশত কিনে সবজির দোকানে গেলাম। সবজির দাম এখানে অনেক বেশি। টমেটো পিছ ২০ টাকা। আলুর কেজি ১০০ টাকা। রসুন পিছ ৩০ টাকা। কাঁচা মরিচ পিছ ১ টাকা করে। কাঁচা মরিচ আমরা গুনে গুনে কিনতাম—কখনও ৫ পিছ, কখনও ১০ পিছ। আর হ্যাঁ, এখানকার অধিকাংশ দোকানদার মহিলা। ১০০% মহিলারা কাজ করে, সে মুসলিম হোক বা অমুসলিম হোক।
ওখানে পাতাকপি বিক্রি হয়, সবজির মতো কেটে কেটে। ছোট ছোট পিস করে একটা পলিথিনে ভরা হয়। প্রতি ব্যাগ ২০ টাকা করে। যাই হোক, সবজিওয়ালা মহিলাকে দাওয়াত দিলাম। ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরলাম, কিন্তু সে দাওয়াত কবুল করল না।
কিছুক্ষণ পর ফেরার পথে দেখি একজন লোক একাই বসে আছে। পরিচয় হলাম। নাম তার সুস্পিতা (পুরুষ)। ১০-১৫ মিনিট কথা বললাম। সে ইসলাম কবুল করল। নাম রাখলাম মুসা। তাকে বললাম, "চলো মসজিদে যাই, তোমাকে নামাজ শেখাবো।" সে রাজি হয়ে গেল। মসজিদে এলাম। তাকে নিজে হাতে ওজু শেখালাম। এরপর আমার পাশে দাঁড় করিয়ে নামাজ শেখালাম। ইফতারির জন্য খেজুর আর কলা রাখাছিলো। সেও ক্ষুদার্থ ছিলো। একাই মনে হয় ৪-৫ টা কলা খেয়ে ফেললো। যোহরের নামাজের আগে সম্ভবত।
কেউ মুসলমান হওয়ার পর তাকে ওজু শেখানো, নামাজ শেখানো—এটা যে কত আনন্দের, ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। সেদিন একজনই মুসলমান হলো। পরের দিন আলহামদুলিল্লাহ দুইজন মুসলমান হলো—তাদের নাম ছিল মিকন ও ডেনিস। তখন পর্যন্ত মোট মুসলমানের সংখ্যা হয় ৯ জন। যদিও প্রথম কিছু মসজীদে কোন লোকাল রাহাবার পাইনি। আমি একা একাই দাওয়াতী কাজ করছিলাম। যদিও পরে যখন কিছু লোকাল রাহাবার পেলাম তখন এই সংখ্যা আস্তে আস্তে বাড়তে লাগলো।
যাই হোক, আবারও মসজিদ পরিবর্তনের পালা।
তাবলিগের পুরুষদের সফরে ৩ দিন পর পর মসজিদ পরিবর্তন হয়, আর মহিলাদের (মাস্তুরাত) সফরে ২ দিন পর।
পরের দিন আমরা চলে এলাম কমোরোক মসজিদে। নামগুলো নিশ্চয়ই আপনাদের কাছে কঠিন লাগছে। আমার কাছেও প্রথম দিন লেগেছিল। কয়েক দিন বারবার উচ্চারণ করতে করতে সহজ হয়ে গেছে। এবার যাকারিয়া ভাইয়ের বাসা। তিনি একজন আলেম। খুব ভালো মানুষ। তাঁরও দুই স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর বাসায় ছিলাম ২ দিন।
এই মসজিদের এলাকায় সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় ছিল—এটাকে স্কুলপাড়া বললেও চলে। আশেপাশে অনেকগুলো স্কুল-কলেজ আছে। আর হ্যাঁ, জোহরের নামাজের সময় মসজিদ ভরে যায় স্কুলের ছাত্রদের দিয়ে। তাদের সাথে কথা বলতে খুব ভালো লাগে। সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো, কেনিয়ায় কোনো শিশু যদি ক্লাস ৪-৫ শেষ করে, তবে সে সুন্দর ইংরেজিতে কথা বলতে পারে। আর কেউ যদি মাদ্রাসার ইবতেদায়ী শেষ করে, তবে সে আরবিতে কথাবার্তা বলতে পারে। এর কারণ আমার কাছে মনে হয়েছে, স্কুলে শিক্ষকরা সবাই ইংরেজিতে কথা বলে। তারা স্থানীয় সোহিলি ভাষায় কথা বলে না। অন্যদিকে, মাদ্রাসাগুলোর অধিকাংশ উস্তাদ সোমালি, যাদের অধিকাংশের ভাষা আরবি। তারা ক্লাসে আরবিতেই বেশি কথা বলেন। তাছাড়া মাদ্রাসার সব বই আরবিতে। এমনকি সীরাতের বই থেকে শুরু করে সব আরবিতে। যার কারণে আরবি শিখতে বাধ্য হয়। আর কোরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ার জন্য আরবির কোনো বিকল্প নেই। আমাদের এই উপমহাদেশে ফার্সি, উর্দু যতটা গুরুত্ব পেয়েছে, আরবি ততটা পায়নি। যার কারণে কোরআনের সাথে আমাদের সম্পর্ক কম।
আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের দেশেও আদিব হুজুরের মতো কিছু অসাধারণ ব্যক্তির কারণে আরবি ভাষা শেখা সহজ হচ্ছে। তাছাড়া অনেক ভিন্নধর্মী প্রতিষ্ঠানও এদেশে গড়ে উঠেছে, যারা নাহু-সরফ ছাড়াই আরবি শেখানোর কাজ করে যাচ্ছে। ইনশাআল্লাহ, পরিবর্তন হবে একদিন...
তবে তার আগে একটু আফ্রিকার স্কুল ও মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে বলে নেওয়া যেতে পারে।
হ্যাঁ, স্কুলগুলোর সিলেবাস নিয়ে তেমন ঘাঁটাঘাঁটি করতে পারিনি। তবে সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এই দেশে আমাদের মতো সারা বছর ক্লাস হয় না। এখানকার স্কুল সিস্টেম হলো প্রতি ৩ মাস পর পর এক মাস বন্ধ। অর্থাৎ জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ ক্লাস হবে, এপ্রিল পুরো মাস বন্ধ। মে, জুন, জুলাই ক্লাস হবে, আগস্ট পুরো মাস বন্ধ। আর সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর ক্লাস হবে, ডিসেম্বর পুরো মাস বন্ধ। শুধু তাই নয়, সপ্তাহে আবার শনি-রবি বন্ধ। আমাদের যে ধারণা—শিশুদেরকে ব্লেন্ডারে ঢুকিয়ে সারা বছর ব্লেন্ডার মেশিন চালালেই শিশু পণ্ডিত হয়ে উঠবে—ওখানে গিয়ে সেই ভুল ভেঙেছে।
আর হ্যাঁ, মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা? এখানকার মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা আরব দেশের মডেল অনুসরণ করে। সিস্টেমটা আমার খুব ভালো লেগেছে। শুরুতে বুঝতে একটু কষ্ট হচ্ছিল। কিছুই ঠিকভাবে মাথায় ঢুকছিল না। তখন একজন স্থানীয় আলেমকে নিয়ে বসলাম। তাকে বললাম, “ভাই, আপনি খাতায় লিখে লিখে পুরো সিস্টেমটা বুঝিয়ে দিন।” তখনই বিষয়টা পরিষ্কার হলো।
তাদের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাটি মূলত চারটি ধাপে বিভক্ত:
১) ইবতেদায়ী – ৬ বছর
২) মুতাওয়াসিতা – ৩ বছর
৩) সানাউয়্যাহ – ৩ বছর
৪) আলিমিয়্যা – ৪ বছর
তাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই সমন্বিত, যেটা নিয়ে মুফতি তাকি উসমানী (হাফিজাহুল্লাহ) বহুবার আলোচনা করেছেন। আমাদের দেশের ওলামায়ে কেরামও এখন এই বিষয়টি নিয়ে বলছেন। আমাদের দেশে যেমন দ্বীনি ও দুনিয়াবি শিক্ষা আলাদা পথে চলে—উলামায় কেরাম পড়েন কওমি মাদ্রাসায়, আর ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়াররা পড়ে সাধারণ স্কুল-কলেজে—সেখানে তেমন নয়।
সেই দেশগুলোতে যারা স্কুলে ক্লাস ওয়ান থেকে সিক্স পর্যন্ত পড়ে, তারা একই সঙ্গে মাদ্রাসার ইবতেদায়ী পর্যায়ও সম্পন্ন করে। অর্থাৎ, কেউ যদি স্কুলে ক্লাস টুতে পড়ে, মাদ্রাসাতেও সে একই ক্লাসে পড়ে। এভাবে তারা ইবতেদায়ী ছয় বছর শেষ করে। আলহামদুলিল্লাহ, ওখানকার মুসলিমরা সাধারণত স্কুল এবং মাদ্রাসা—দুটোতেই পড়ে। একসঙ্গে পড়ার এই ব্যবস্থার কারণে এমন কোন মুসলিম বাচ্চাকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল, যে শুধু স্কুলে পড়ে মাদ্রাসায় পড়ে না। ফলে দেখা যায়, ওসব দেশের অধিকাংশ মানুষই সহিহভাবে কোরআন তিলাওয়াত করতে পারে। আমাদের দেশে তা উল্টো।
এখন প্রশ্ন হলো, তারা স্কুল ও মাদ্রাসাকে কীভাবে একসঙ্গে চালায়?
মূলত, স্কুলগুলো বছরে তিন মাস ছুটি পায়, আর ওই সময়টাতে মাদ্রাসা ফুলটাইম চলে। এছাড়া স্কুলে প্রতি সপ্তাহে শনিবার ও রবিবার ছুটি, ওই দুই দিনও মাদ্রাসা পূর্ণ সময় চালু থাকে। অন্যদিকে, মাদ্রাসার সাপ্তাহিক ছুটি বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার। আর স্কুল চলাকালীন সময়ে বাচ্চারা স্কুল শেষে এক ঘণ্টার জন্য মাদ্রাসায় আসে। পুরো ব্যবস্থাটা সত্যিই চমৎকার।
ইবতেদায়ী পর্যায়টা সবাই করে থাকে। এরপর যারা আগ্রহী, তারা বাকি ধাপগুলোও সম্পূর্ণ করে—স্কুল ও কলেজের পাশাপাশি। যেমন, ক্লাস নাইনের মধ্যে মুতাওয়াসিতা শেষ হয়, কলেজ শেষ হয় সানাউয়্যাহর সঙ্গে, আর আলিমিয়্যা সম্পন্ন হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী বিভাগে ভর্তি হয়, তারাই “আলেম” হিসেবে গণ্য হন। তারা আলেম হলেও যেহেতু জাতীয় কারিকুলামের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাই চাইলে সরকারি চাকরি থেকে শুরু করে যেকোনো পেশায় যুক্ত হতে পারেন।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী বিভাগে ভর্তি হওয়ার আগে পূর্ণ এক বছর শুধু আরবি ভাষা শেখানো হয়। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনাও পুরোপুরি আরবিতে হয়। ছাত্র ও শিক্ষক সবাই আরবি ভাষায় কথা বলেন। ওখানকার অধিকাংশ প্রফেসরই মদীনা বিশ্ববিদ্যালয় অথবা অন্য কোনো আরব বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট।
যাই হোক, কোথা থেকে কোথায় যেন চলে গেলাম!
ফিরে আসি আবার কমরোক মসজিদে। মসজিদের একেবারে পাশেই ‘আল মাখতুম একাডেমি’। প্রিন্সিপাল ইগেসা সোলাইমান। স্কুলটিতে প্রায় ৬০০ বাচ্চা পড়ে। খুব ইচ্ছে হলো ওদের সঙ্গে কথা বলার। আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম—তিনি দোয়া কবুল করলেন।
তাবলিগের এক সাথী ভাই, যিনি একইসঙ্গে মসজিদ কমিটির দায়িত্বশীল একজন, তিনি আমাকে স্কুল প্রিন্সিপালের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিলেন। প্রিন্সিপাল সাহেব খুবই ভালো মানুষ এবং আন্তরিক মুসলমান। আমাকে পেয়ে তিনিও আনন্দিত হলেন। যখন আমি তাকে অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াতি কাজের কথা বললাম, তিনি খুব খুশি হলেন। আমি তাঁকে আমার খ্রিস্টানদের নিয়ে লেখা বই "মেরী থেকে মারইয়াম" হাদিয়া দিলাম। তিনি বইটি দেখে অনেক খুশি হলেন।
উল্লেখ্য, আমার দুটি বই—"দুই বান্ধবী" (হিন্দুদের নিয়ে) এবং "মেরী থেকে মারইয়াম" (খ্রিস্টানদের নিয়ে)—বাংলাদেশে ইতোমধ্যে হাজার হাজার কপি বিক্রি হয়েছে। আফ্রিকা যাওয়ার আগে "মেরী থেকে মারইয়াম" বইটির ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ করে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম এবং অনেককেই হাদিয়া হিসেবে দিয়েছি।
বইটির পিডিএফ: http://tiny.cc/marryto
আরও আনন্দের বিষয়, প্রিন্সিপাল সাহেব ড. জাকির নায়েককে ভালোভাবে চেনেন এবং তার লেকচার নিয়মিত শুনেন—জেনে আমি খুবই খুশি হলাম।
আমি তাকে বললাম, “বাংলাদেশে আমার একটি স্কুল রয়েছে। আমি ইচ্ছুক আপনার স্কুলের বাচ্চাদের সঙ্গে কিছু সময় কাটাতে, একটু গল্প করতে চাই।” তিনি হাসিমুখে বললেন, “ঠিক আছে, আগামীকাল পিটি (PT) টাইমে আসুন। কারণ এখন সবাই আলাদা ক্লাসে আছে, একসঙ্গে পাবেন না। কাল পিটি-র সময় ৬০০ বাচ্চাই একসাথে থাকবে, তখন কথা বলা সুবিধা হবে।”
আরেকটা মজার বিষয়—আফ্রিকার স্কুল শুরু হয় ফজরের কিছু পরেই! আমরা ফজরের নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বের হতেই দেখি, বাচ্চারা স্কুলে আসা শুরু করে দিয়েছে। অফিস-আদালতও শুরু হয় ফজরের পরপর, আর রাত ৮টার মধ্যে শহর ফাঁকা হয়ে যায়। এটা আমি নেপালেও দেখেছিলাম।
পরদিন নির্ধারিত সময়েই হাজির হলাম। রাতেই ভাবছিলাম—বাচ্চাদের সামনে গুরুগম্ভীর কিছু আলোচনা করব। কিন্তু যখন মঞ্চে উঠলাম, আর এত ছোট ছোট মিষ্টি মুখগুলো দেখলাম, তখন আমার সব "গুরুগম্ভীর" ভাবটাই উবে গেল! মনে হলো—ওরা কী বুঝবে এমন সব আলোচনা। বুঝলাম, গল্প বললেই বেশি উপভোগ করবে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কে কে গল্প শুনতে ভালোবাসে?” দেখা গেল, পৃথিবীর সব বাচ্চার মতো এখানকার বাচ্চারাও গল্প শুনতে ভালোবাসে। বললাম, “আজকে আমি তোমাদের দুটো গল্প শোনাবো—একটা হাতি আর পিঁপড়ার গল্প, আরেকটা হুদহুদ পাখির গল্প।”
গল্প শুরু করলাম হাতি দিয়ে—
"এক বনে ছিল একটা অনেক বড় হাতি (সোয়াহিলিতে: এনডোভো কুব্বা)। সেই বনে আরও ছিল একটা ছোট্ট পিঁপড়া (সোয়াহিলিতে: সিসিমিজি কিডোগো)। একদিন ওই হাতির সঙ্গে পিঁপড়ার বিয়ে হয়!"
এমন কথা শুনেই বাচ্চারা হেসে লুটোপুটি খেতে লাগল।
আমি চালিয়ে গেলাম, “বিয়ের কিছুদিন পর তাদের একটা সন্তানও হলো, এবং সেই সন্তানটি হলো পিঁপড়া। তাহলে এই গল্প থেকে আমরা কী শিখলাম?”
বললাম, “Ant is the son of Elephant!”
তারপর জিজ্ঞেস করলাম, “তোমরা বলো, এটা কি সম্ভব?”
সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, “না! এটা কখনোই সম্ভব না!”
আমি গল্প বলছিলাম ইংরেজিতে, মাঝে মাঝে সোয়াহিলি শব্দ ব্যবহার করছিলাম, যাতে তারা আরও আনন্দ পায়।
এছাড়াও আমি চ্যাটজিপিটি দিয়ে একটি ছবি বানিয়েছিলাম—যাতে দেখা যায়: একটি বিশাল হাতি, তার পাশে তার স্ত্রী পিঁপড়া, এবং তাদের সন্তানও একটি পিঁপড়া। আমি মোবাইল থেকে ছবিটা বের করে সবাইকে দেখালাম। বললাম, “এবার কি তোমরা বিশ্বাস করছ?”
ওরা বলল, “না!”
আমি বললাম, “তোমাদের কথাই ঠিক।”
এরপর বললাম, “দেখো, আল্লাহু আকবার! অর্থাৎ আল্লাহ অনেক বড়—আল্লাহ কুব্বা সানা। অন্যদিকে মাদার মেরী অনেক ছোট—মাদার মেরি কিডোগো। আল্লাহর তুলনায় তিনি তো পিঁপড়ার চেয়েও ছোট।”
আমি বললাম, “কিছু মানুষ ভুল করে আল্লাহর সঙ্গে মাদার মেরিকে যুক্ত করে এবং বলে, জেসাস আল্লাহর পুত্র।
তোমরা বলো, যদি পিঁপড়া হাতির সন্তান হতে না পারে, তবে জেসাস কি আল্লাহর পুত্র হতে পারে?”
সবাই সমস্সরে বলে উঠলো নো নো।
এইভাবে আমি শিশুদের মনে তাদের একটি মৌলিক আকিদা বিশ্বাসের একটু গুরুত্বপূর্ন বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করলাম, হাস্যরস ও গল্পের মাধ্যমে।
এরপর উম্মতের জিম্মাদারী বোঝানোর জন্য সংক্ষেপে হুদহুদ পাখি এবং সোলায়মান আঃ এর ঘটনাকে বললাম। এরপর সবাইকে বললাম তোমরা কে কে জান্নাত বা প্যারাডাইস এ যেতে চাও। সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলো আমরা সবাই। তখন বললাম মান কলা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ দাখালাল জান্নাহ । সবাই আমার সাথে একবার বল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। যদিও ওই স্কুলে অনেক মুসলমানের সাথে অনেক খ্রিস্টানও ছিল। সবাইকেই একবার কালেমা পড়ে হাসিমুখে এবং যাতে সবাই শিক্ষকদের কথা শুনে এরকম কিছু কথা বলে হাসিমুখে শেষ করে দিলাম।
ওই দিনের পর থেকে মসজিদের সবাই আমাকে চিনে ফেলল।
প্রথম দিন দাওয়াতি কাজের উদ্দেশ্যে একটি গ্যারেজে গেলাম। অনেকের সঙ্গে কথা হলো। আলহামদুলিল্লাহ, তার মধ্যে দুজন ইসলাম গ্রহণ করলেন। প্রথমজনের নাম ছিল ডেনিয়াল—তার নাম রাখা হলো মূসা। দ্বিতীয়জনের নাম ছিল মুআন, তাকে আমরা নাম দিলাম মুহাম্মদ।
অন্যদিকে আমার আহলিয়াও এক সুসংবাদ জানালেন। জাকারিয়া ভাইয়ের বাসায় দুজন গৃহকর্মী ছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ, তাদের দুজনকেই কালিমা পড়িয়ে মুসলমান বানানো হয়েছে। এখন তারা আহলিয়াদের সঙ্গে তালিমেও অংশ নিচ্ছেন, নামাজও পড়ছেন।
উল্লেখ্য, ওই মসজিদে আমরা প্রায় পাঁচ দিন ছিলাম। আমাদের মাস্তুরাত জামাত ছিল দুই ভাগে—দুই দিন ও তিন দিন করে দুটি ঘরে অবস্থান করেছিল।
পরের দিন আমি তাদের যোহরের নামাজের ব্রেকে ১০–১২ জন বাচ্চাকে অমুসলিমদের কীভাবে সহজভাবে দাওয়াত দিতে হয়, তা শেখাচ্ছিলাম। উদাহরণ দিয়ে বললাম:
“If Jesus is God, then I am also God. Why?
Jesus used to go to toilet, I also go to toilet.
Jesus used to eat, I also eat.
Jesus used to sleep, I also sleep.”
বাচ্চারা এটা শুনে বেশ মজা পেল।
এরপর আমি বললাম:
“Jesus was a Muslim. Do you know why?
If you see any photo of Jesus or Mother Mary on a vehicle, you’ll notice:
— Jesus always has a beard, like a Muslim.
— Mother Mary always wears hijab, like a Muslim woman.
— Jesus was circumcised on the 8th day. Muslims are also circumcised.
— Jesus fasted for 40 days. We Muslims also fast.
— Jesus never drank alcohol. Muslims also don’t.”
তাই, —জেসাস ছিলেন মুসলিম।
আমি বললাম, “তোমরাও এইভাবে সহজ ভাষায় সবাইকে ইসলামের দাওয়াত দিবে।
ওদের ক্লাসের টাইম শুরু হলো ওরা চলে গেলে।
পরের দিন আমি রুমে ছিলাম। মসজিদে জামাত থাকার জন্য একটি আলাদা রুম বরাদ্দ ছিল, আমরা সেখানেই থাকতাম। হঠাৎ অনেকগুলো বাচ্চা বাইরে থেকে ডাকতে লাগল—
“শায়েখ মারছুছ! কুজা, কুজা! কাম, কাম!”
(মানে: শায়েখ, আসুন আসুন, চলুন চলুন)
আমি ভাবলাম, আবার কী হলো? বাইরে এসে দেখি, অনেকগুলো বাচ্চা একজনকে মাঝখানে ধরে নিয়ে আসছে। তারা বলল, “দিস গাই ইজ ক্রিশ্চিয়ান। মেক হিম মুসলিম।”
আমি বললাম, “Let’s go to the mosque.”
সবার সঙ্গে তাকে মসজিদে নিয়ে গেলাম।
দেখলাম, ছেলেটা সম্ভবত গ্রেড সিক্সে পড়ে। আমি তাকে কিছু সময় সহজভাবে দাওয়াত দিলাম—প্রায় ১০–১৫ মিনিট কথা বলার পর আলহামদুলিল্লাহ, সে কালেমা পড়ে মুসলিম হয়ে গেল।
কালেমা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আশপাশের বাচ্চারা এত খুশি হলো যে হাততালিতে পুরো মসজিদ যেন গমগম করে উঠল!
আমি তখন ওদের বললাম, “তোমরাই এখন ওর শিক্ষক। তোমরাই ওকে সব শিখাবে।”
এরপর আমরা যত দিন মসজিদে ছিলাম, প্রতিদিনই সেই দৃশ্য চোখে পড়েছে—
কেউ ওকে ওযু শেখাচ্ছে, কেউ নামাজ শেখাচ্ছে, আর সবাই মিলে প্রতিটি নামাজে তাকে নিয়ে মসজিদে আসছে।
দৃশ্যটা সত্যিই ছিল হৃদয় ছোঁয়া এবং অনুপ্রেরণামূলক।
সেই দিন আরও চারজন ইসলামের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে মুসলমান হন। পরদিনও চারজন ইসলাম গ্রহণ করেন—জুলিয়া থেকে মুহাম্মদ, ম্যাথিউ থেকে মুহাম্মদ, এবং কলিংস থেকেও মুহাম্মদ নাম রাখা হয়।
আমি চেষ্টা করেছি প্রত্যেক নওমুসলিমের পুরনো নাম, নতুন নাম এবং মোবাইল নম্বরসহ একটি ডাটাবেস তৈরি করে সংরক্ষণ করতে, যেন ভবিষ্যতে কেউ দাওয়াতি উদ্দেশ্যে সেখানে গেলে তাদের ফলোআপ করতে পারেন। পাশাপাশি, প্রত্যেক মসজিদের ইমাম এবং তাবলিগের সাথীদের সঙ্গে নওমুসলিমদের সংযুক্ত করে দেওয়ারও চেষ্টা করেছি।
কলিংস বলেছিল, সে দিনে কাজের জন্য ব্যস্ত, রাতে সময় পাবে। তাই আমি রাতেই তাকে ফোন করি—এশার নামাজের আগে। সে মসজিদে আসে। আমি তাকে অজু শেখাই, সে আমাদের সাথে এশার নামাজ পড়ে। তার বাসা মসজিদ থেকে অনেক দূরে, ট্রেনে যেতে হয়। রাত ১০টার ট্রেন ধরতে হয়। তাই তারাবির নামাজে ২ রাকাত পড়েই তাকে ট্রেন ধরার জন্য বলি।
এইভাবে মুসলমান হওয়া মানুষের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১৯ জন। এর পুরো তথ্য আমি PDF ফরম্যাটে সংরক্ষণ করেছি, যেন দাওয়াতের কাজ করতে যাওয়া কেউ সহজে ফলোআপ করতে পারেন।
এরই মধ্যে আমার আহলিয়ারা বাসা পরিবর্তন করে আব্দুস সালাম সাহেবের বাসায় চলে যান। ঐ ভাই একদিকে আমেরিকার সিটিজেন, আবার কেনিয়ারও সিটিজেন। ডুপ্লেক্স বাড়ি । ওখানেও দুইজন খাদেমা ছিলেন।
আহলিয়া তাদের একজনকে আলহামদুলিল্লাহ ইসলামের পথে আনতে সক্ষম হন। কিন্তু আরেকজন ছিলেন অনেক কট্টর, যিনি সহজে কিছুতেই শুনতেন না। সে বাইবেল থেকেও কিছু বলার চেষ্টা করেছে। আমি বললাম, “ঠিক আছে, আমরা খাওয়ার সময় যাব, তখন ইনশাআল্লাহ তাকে দাওয়াত দেবো।”
আমরা সাধারণত বাসায় গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করতাম। সেদিনও খাওয়ার সময় আমি তাকে দরজায় পাশে ডাকলাম। সে দরজার পাশে দাঁড়াল। যেহেতু সে আগেই আহলিয়ার দাওয়াত ফিরিয়ে দিয়েছে, তাই আমি চিন্তা করলাম যুক্তি বা তর্ক দিয়ে তাকে বোঝানো যাবে না। তাকে শুধু মোহাব্বত দিতে হবে। আমি শুরু করলাম এইভাবে:
"We love you."
"তুমি জানো, আমি তোমাকে কেন ভালোবাসি? কারণ তুমি আর আমি একই বাবা-মায়ের সন্তান—Adam and Eve। তাঁরা আমাদের প্রথম পিতা-মাতা। তুমি আমার বোন। আমি চাই, তুমি আমার বোন হয়ে আমার সঙ্গে জান্নাতে থাকো।"
মানুষ সাধারণত গৃহকর্মীদের সাথে রুক্ষভাবে কথা বলে। কিন্তু আমি তাকে এমনভাবে মোহাব্বতের সাথে কথা বললাম যে সে কোনো কথাই বলতে পারছিল না। আমিও তাকে এমন কোনো কথা বলছিলাম না যাতে সে ডিবেট করার সুযোগ পায়। তাছাড়া সেও চিন্তা করছিলো এবং অবাক হচ্ছিলো যে একজন বিদেশী মানুষ আমার সাথে এত ভালোভাবে কেন কথা বলছে?
এইভাবে মাত্র ৫–৭ মিনিট কথা বলার পর—আলহামদুলিল্লাহ—সে কালেমা পড়ে মুসলমান হলো।
পরে আমার আহলিয়া খুব খুশি হয়ে বললেন, "আমি তো ভেবেছিলাম সে কখনও কালেমা পড়বে না।"
আমি বললাম, "তোমার চিন্তাটা ভুল না। কিন্তু সে আমার হাতে কালেমা পড়েছে—এটা আমার কোনো কৃতিত্ব নয়। বরং আমি মনে করি, এইসব মানুষের জন্য আমার চোখে যতো অশ্রু ঝরেছে, যে চোখের পানির উছিলায় আল্লাহ এদের এত সহজেই কবুল করে নিচ্ছেন।"
অন্যদিকে আব্দুস সালাম ভাই আমার এই দাওয়াতি কর্মকাণ্ড দেখে এতটাই অনুপ্রাণিত হলেন যে তিনি পুরোপুরি আমার সঙ্গী হয়ে গেলেন। সবসময় আমার সাথে থাকতেন। কিছুক্ষণ পরপরই বলতেন, “মারছুছ, চলো আমার এক পুরোনো ড্রাইভার আছে, তার কাছে যাই” অথবা **“চলো, ওখানে যাই”—**এভাবেই একের পর এক জায়গায় দাওয়াতের উদ্দেশ্যে যেতে লাগতাম।
আমারও ভালো লাগছিল। কারণ শুরুতে আমি একা ছিলাম, কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমাকে একজন দাওয়াতি সাথী দিয়ে দিলেন।
আব্দুস সালাম ভাই নিজেও তাবলিগের একনিষ্ঠ সাথী, দুইবার তিন চিল্লা দিয়েছেন। কিন্তু তিনি বলছিলেন—সাধারণত তিনি দেখেছেন তাবলিগের কাজ মুসলিমদের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে, অমুসলিমদের মাঝে এভাবে সরাসরি মেহনত এর আগে কখনো দেখেননি। তাই আমার সাথে থেকে তার মনে হচ্ছিল, যেন তিনি সাহাবায়ে কেরামের যুগে ফিরে গেছেন।
একদিন তাঁর বাসায় তাঁর সন্তানের এক অমুসলিম গণিত শিক্ষক এসেছিলেন। আব্দুস সালাম ভাই বললেন, “চলো, ওকে দাওয়াত দিই।”
আমি ওনার সাথে গেলাম। শিক্ষকটি ছিলেন ভদ্র এবং চিন্তাশীল। আলহামদুলিল্লাহ, কিছু কথা বলার পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
সেদিন রাত হয়ে গিয়েছিল। তারাবির নামাজ শেষ করেছি, শরীর ক্লান্ত। রাত প্রায় ১১টা। এমন সময় আব্দুস সালাম ভাই আবার এসে বললেন, “মারছুছ, চলো! আর একজনকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করি।”
তার কণ্ঠে এমন আগ্রহ আর ঈমানি উত্তেজনা ছিল, মনে হচ্ছিল, যেন নবীদের যুগের কোনো সহচর দাওয়াতের ময়দানে ডাক দিচ্ছেন।
তিনি বলছিলেন,
“তোমার সাথে গাশত করে মনে হচ্ছে, আমি যেন সাহাবিদের সেই পুরোনো মেহনতের যুগে ফিরে গেছি।”
আমরা বের হলাম ওনার এক পুরনো অমুসলিম বন্ধুর সাথে দেখা করতে। কিন্তু গিয়ে দেখলাম, সে বাড়িতে নেই। তবে সেখানে আরেকজন ভাইয়ের সাথে দেখা হলো, নাম মূসা। আলাপচারিতায় জানলাম, তিনি ৯ বছর আগে মুসলমান হয়েছেন, কিন্তু তাঁর মা এখনও অমুসলিম।
আমি বললাম, “চলো, তোমার মায়ের সাথে দেখা করি।”
আমরা তখন বাড়ির নিচতলায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। তিনি ওপরে গিয়ে তাঁর মাকে ডাকলেন। কিছুক্ষণ পর তাঁর মা নিচে নামলেন। আমি তাঁকে খুব মোহাব্বতের সাথে দাওয়াত দিলাম। কিছুক্ষণ কথা বলার পর, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর কৃপায় তিনি কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেলেন।
মূসা ভাই এতটাই খুশি হলেন যে চোখে পানি নিয়ে বলছিলেন, “আমি ৯ বছর ধরে একজন অমুসলিম মায়ের সাথে বসবাস করছিলাম। আজ, তোমাদের উছিলায় আমি একজন মুসলিম মা পেলাম।”
ঐ মসজিদেই অবস্থানকালে রমজানের শেষ দশক শুরু হলো।
আল্লাহু আকবার!
রমজানের শেষ দশক দেখতে হলে হয় আরবের কোনো শহরে, নয়তো আফ্রিকার কোনো প্রাণবন্ত মুসলিম এলাকায় যেতে হয়!
সাধারণত পুরো রমজানজুড়েই তারাবির নামাজে পুরুষ ও নারী উভয়ই অংশগ্রহণ করতেন। কিন্তু শেষ দশক শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যপটই পাল্টে গেল।
এ যেন কিয়ামুল লাইলের এমন এক তীব্র ঢেউ, যা পুরো এলাকার হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়লো।
পুরুষ, নারী, বৃদ্ধ, যুবা—কে নেই সেখানে? প্রতিটি মসজিদেই ছিল নারীদের জন্য পৃথক নামাজের জায়গা।
আমরা যে মসজিদে ছিলাম, সেখানে মহিলাদের জায়গা শেষ দশকে যথেষ্ট না হওয়ায় একটি বিশাল তাবু টানানো হলো। তাই নির্ধারিত স্থানের পরে বাকিদের তাবুর মধ্যে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করলেন।
প্রথম রাতের আট রাকাত শেষ হতে হতে রাত প্রায় দশটা-এগারোটা। এরপর কিছুটা বিশ্রাম, তারপর দুটা বাজতেই আবার শুরু হলো কিয়ামুল্লাইল।
এমনও দেখা গেল—এলাকার এমন কোনো মুসলিম মা-বোন নেই যিনি রাতে মসজিদে আসেননি। যেন পুরো সমাজটাই সেজে উঠেছে ইবাদতের আমেজে।
এদিকে এলাকার স্কুলের বড় ছাত্ররা সবাই ভলান্টিয়ার ইউনিফর্ম পরে রাত একটা থেকেই এলাকার প্রতিটি গলিতে দাঁড়িয়ে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।
ইমাম সাহেবের কেরাত—আল্লাহ!
চোখের পানি আর হৃদয়ের কাঁপন মিলেমিশে এক অতল তৃপ্তির জোয়ার বয়ে গেল পুরো মসজিদজুড়ে।
আমরাও আমাদের আহলিয়াদের কয়েকদিন কিয়ামুল্লাইলের জন্য রাতে মসজিদে নিয়ে আসতাম তারাও যাতে নিজের চোখে আফ্রিকার রমজানের শেষ দশকের এই দৃশ্য দেখতে পায়।
পরের দিন আরও কিছু মানুষ মুসলমান হলেন এর মধ্যে ফান্ডি থেকে ইয়াকুব, আলেক্স থেকে ইউসুফ, ওমোলো থেকে জাকারিয়া ইত্যাদি।
পরের দিন মসজিদ পরিবর্তনের পালা। গাড়ি আসার ঠিক কিছুক্ষণ আগে আব্দুস সালাম ভাই দৌড়ে এলেন—একজন ভাইকে দাওয়াত দিতে হবে। উনি চার্চের একজন বিশপ এবং এই এলাকার অনেকগুলো বিল্ডিংয়ের মালিক। উনি যদি মুসলমান হন, তাহলে এটি একটি বড় অর্জন হবে। আমি বললাম, "ঠিক আছে, ইনশাআল্লাহ। দরকার হলে গাড়ি অপেক্ষা করবে, কিন্তু আমি তাঁকে দাওয়াত না দিয়ে যাব না।"
আফ্রিকায় গিয়ে যখন খ্রিস্টানদের দাওয়াত দিতাম, তখন কোরআনে বর্ণিত খ্রিস্টানদের বিষয়গুলো খণ্ড খণ্ড আকারে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতাম। পরে মনে হলো, যদি একটি ভিডিও তৈরি করি, যেখানে খ্রিস্টানদের সব প্রশ্নের উত্তর কোরআনের আলোকে দেওয়া হবে, তাহলে দাওয়াতের কাজ আরও সহজ হবে। সেই ভাবনা থেকে ভিডিওটি তৈরি করলাম। সেটি একটি মূল্যবান সম্পদে পরিণত হলো, যেখানে এক ভিডিওতে খ্রিস্ট ধর্মের সমস্ত আকিদা কোরআনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি অনেককে ইসলাম গ্রহণে সাহায্য করেছে।
ভিডিওটি:
👉 https://youtu.be/6dedJO2zdc0
বাংলাদেশে ফিরে অনেকেই অনুরোধ করলেন ভিডিওটির বাংলা ভার্সন তৈরি করার জন্য। আলহামদুলিল্লাহ, কোরবানির ঈদের বন্ধে একটু ফ্রি সময় পেয়ে বাংলা ভার্সনও প্রকাশ করা হলো:
👉 https://youtu.be/MfgjxNY5y_w
যাইহোক, যেহেতু তিনি একজন বিশপ ও চার্চের দায়িত্বশীল ব্যক্তি, তাই ভেবেছিলাম তাঁকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। প্রথমে কোরআন থেকে শুরু করে পুরো ভিডিওটি দেখালাম এবং ব্যাখ্যা করলাম। এরপর বাইবেল নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম। প্রায় আধা ঘণ্টার দাওয়াতের পর, আলহামদুলিল্লাহ, তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। আব্দুস সালাম সাহেব অত্যন্ত খুশি হলেন। তাঁর পূর্বের নাম ছিল জোহান; তাঁর পছন্দ অনুযায়ী নতুন নাম রাখা হলো হাসান।
এই মসজীদ পর্যন্ত মোট নওমুসলিমের সংখ্যা গিয়ে দাড়ালো ২৬ ।
ইনশাআল্লাহ পরবর্তী পর্ব লেখা শেষ হলে আপডেট দেওয়ার চেষ্টা করবো…
(১ম পর্ব: https://misc.iom.edu.bd/mobileapps/Marsus-EduVerse/blog/africa )