আমাদের সফর চলছিল উত্তরবঙ্গের পথে। সঙ্গে ছিলেন আমাদের অত্যন্ত প্রিয় ভাই, মুরসালিন নিলয়। পথের গল্পে গল্পে একসময় উঠে এলো আফ্রিকার প্রসঙ্গ—ইতিহাস, মানুষ, আর বদলে যাওয়া সময়ের কথা। আলোচনা হচ্ছিল, কীভাবে সেই অঞ্চলের বহু দেশে মাত্র দুইশ বছরের ব্যবধানে শূন্য থেকে প্রায় নব্বই শতাংশ মানুষ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছে।
মুরসালিন ভাই বললেন,
“ভাই, আপনি উগান্ডা গেলে মুজাহিদ ভাইয়ের খামারটা ঘুরে আসবেন। সেখানে অনেক খ্রিস্টান ভাই কাজ করেন।”
আলহামদুলিল্লাহ, উগান্ডা সফরের এক পর্যায়ে মুজাহিদ ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হলো। তিনি আন্তরিকভাবে একটি গাড়ির ব্যবস্থা করে দিলেন। কামপালা শহর থেকে শুরু হলো আমাদের দীর্ঘ যাত্রা—প্রায় চারশ কিলোমিটার দূরের পথে।
সেখানে পৌঁছে ফার্মের ভেতরে সুন্দর একটি কটেজে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো। মুজাহিদ ভাই এমন সুযোগ করে দিলেন, যাতে আমরা সকল কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলতে পারি।
ফজরের নামাজের পর তাদের দৈনিক অ্যাসেম্বলির সময় দাওয়াতের সুযোগ মিলল। শান্ত পরিবেশে প্রায় এক ঘণ্টা সময় ধরে কথা হলো—ইসলামের সৌন্দর্য, তাওহীদের আহ্বান, নবীজির (ﷺ) দাওয়াতের মর্ম, বাইবেল ও ইসলামের মিল, ঈসা (আ.) ও মরিয়ম (আ.) সম্পর্কে সত্য আলোচনা।
আলহামদুলিল্লাহ, কথাগুলো তাদের হৃদয়ে পৌঁছেছিল। অধিকাংশ খ্রিস্টান ভাই ইসলামকে সত্য বলে উপলব্ধি করলেন। শেষ পর্যন্ত প্রায় পঁচিশ জন ভাই কালেমা পড়ে ইসলামের ছায়াতলে এসে গেলেন।
সেখানে আমাদের দুইজন বাঙালি মুসলিম ভাই কাজ করেন। নতুন মুসলিম ভাইদের দেখভালের দায়িত্ব তাদের ওপর অর্পণ করা হলো। আমরা তাদের ওযু শেখালাম, নামাজের প্রাথমিক কিছু আমল হাতে-কলমে দেখালাম। জামাতে নামাজ আদায়ের ব্যাপারেও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে আসলাম।
মুহূর্তগুলো ছিল গভীর, আবেগময় ও কৃতজ্ঞতায় ভরা। আল্লাহ তাআলা সকল নওমুসলিম ভাইদের কবুল করুন।
যাই হোক, প্রায় দুই মাসের দীর্ঘ সফর শেষ হতে চলেছে। এখন দেশে ফেরার পালা। তবে আলহামদুলিল্লাহ, গতবারের মতো এবারও একটি জামাত প্রস্তুত করে দেওয়া হয়েছে। তারা ইনশাআল্লাহ প্রতি দুই–তিন মাস পরপর সরাসরি অমুসলিম ভাইদের মাঝে দাওয়াতের কাজ করবে।
যে সব আফ্রিকান ভাই আমাদের সঙ্গে ওই অঞ্চলগুলোতে ছিলেন, তারাও দাওয়াতের কাজকে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছেন। সেখানে তিনটি মারকাজে আমরা জোড় করেছি। প্রত্যেক জোড়ে প্রায় ৩০–৫০ জনের সমাগম হয়েছে। কীভাবে বাস্তবে অমুসলমানদের মাঝে দাওয়াতের কাজ করতে হয়—এ বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারা খুব আনন্দিত হয়েছেন এবং নিজেরাও দাওয়াতের কাজে নিয়ত করেছেন।
তারা বারবার অনুরোধ করেছেন—এ ধরনের অমুসলমানদের মাঝে দাওয়াতি জামাত যেন নিয়মিত পাঠানো হয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—বারবার যাওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন। সবচেয়ে বড় একটি বাধা হলো খরচ। ব্যক্তিগতভাবে, বছরে একবার বিদেশ সফর করার জন্য সারা বছর ধরে অর্থ জমা করা প্রয়োজন হয়।
যাদের সামর্থ্য আছে এবং যারা তাবলীগের মেহনতে অন্তত তিন চিল্লা দিয়েছেন, তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। ইনশাআল্লাহ, কোথায়, কীভাবে—সব বিষয়ে আমরা সহযোগিতা করব। যাদেরকে আমরা আফ্রিকায় দায়ী হিসেবে প্রস্তুত করেছি, তারাও সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন ইনশাআল্লাহ।
তবে অন্তত তিনজনের একটি জামাত থাকতে হবে। ইংরেজি ভাষা জানতে হবে। প্রতি জনের আনুমানিক খরচ এক চিল্লার জন্য প্রায় দুই লক্ষ টাকা। কারণ শুধু বিমান ভাড়াতেই প্রায় এক লক্ষ টাকার বেশি ব্যয় হয়।
আলহামদুলিল্লাহ, এই সফরের ফলাফলও অত্যন্ত অনুপ্রেরণামূলক। প্রায় ১৬০ জন মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছেন।
এর মধ্যে—
* উগান্ডায় প্রায় ৪০ জন।
* রুয়ান্ডায় প্রায় ৫ জন।
* ইথিওপিয়ায় (আবিসিনিয়া) প্রায় ১০ জন।
* আর কেনিয়ায় প্রায় ১০০ জন।
গত বছর আলহামদুলিল্লাহ, ২২৪ জন মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এরপর ডিসেম্বর মাসে আমাদের মেহনতে আফ্রিকান ভাইয়েরা একটি দাওয়াতি জামাত বের করেছিলেন। সেই মেহনতের মাধ্যমে আরও প্রায় ৬০ জন ইসলাম গ্রহণ করেন।
আপনারাও যদি ফিকির নিয়ে আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার উদ্দেশ্যে এই মেহনতে অংশগ্রহণ করতে পারেন, ইনশাআল্লাহ, আপনাদের মাধ্যমেও আরও অনেক মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আসবেন।
সর্বোপরি, আসুন আমরা সবাই দোয়া করি—আল্লাহ তা'আলা যেন আমাদের সবাইকে তাঁর দ্বীনের জন্য কবুল করেন, আমাদের ইখলাস দান করেন এবং পৃথিবীর সর্বত্র তাঁর দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার তাওফিক দান করেন। আমীন।