← Back to blogs
আফ্রিকার সফরনামা: ৩য় পর্ব
Eng. Khandaker Marsus · Aug 18, 2026
একই ধারাবাহিকতায় একটু বিরতি হোক। আপনারা অনেকেই একটি কথা শুনেছেন—আফ্রিকার দ্বীনি অবস্থা দেখে শুধু আল্লাহর কাছে চোখের পানি পড়ছে। কিন্তু কেন পড়েছিল, সেটাই ইনশাআল্লাহ আজ আলোচনা করব।
প্রথম দুই পর্বে যারা এত এত মানুষ ইসলামের ছায়ায় আসার খবর শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়েছিলেন, আজকের পর্বে এসে হয়তো সেই আনন্দ এক গভীর আফসোসে রূপ নেবে।
কেনিয়ায় ইসলাম প্রবেশ করে ৮০০ খ্রিস্টাব্দে, অর্থাৎ ১৮৫ হিজরিতে। রাসূল (সা.)-এর ওফাতের মাত্র ১৬৮ বছর পর। দাওয়াতি কাফেলা এসে পৌঁছায় পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে। মানুষ তখন আন্তরিকভাবে ইসলামের আহ্বানে সাড়া দেয়। ইসলামে সৌন্দর্যে লক্ষ লক্ষ মানুষ, যারা পূর্বে উপজাতীয় নানা ধর্মে বিশ্বাসী ছিল, তারা ইসলাম গ্রহণ করে। দাওয়াতি দলটি আসে মূলত মুম্বাসায়—যা কেনিয়ার একটি উপকূলীয় বন্দরনগরী, অনেকটা আমাদের চট্টগ্রামের মতো। সেসময় আকাশপথের যান না থাকায়, জাহাজই ছিল প্রধান বাহন।
এরপর প্রায় ১ হাজার বছর পর, ১৮৪৪ সালে, প্রথম জার্মানি থেকে একজন খ্রিস্টান মিশনারি কেনিয়ায় আসেন, যার নাম ছিল জোহান ক্রাফ। উনি আশার পূর্বে এই দেশ খ্রিস্টানের সংখ্যা প্রায় জিরো ছিলো। এদেশে এসে তিনি সোয়াহিলি ভাষা শেখেন এবং প্রথম বাইবেল সোয়াহিলি ভাষায় অনুবাদ করেন। তিনি প্রথম গির্জা প্রতিষ্ঠা করেন মুম্বাসার রেবেন শহরে। তিনিও মুম্বাসা দিয়েই প্রবেশ করেন, যেহেতু তখনো জাহাজই ছিল প্রধান যানবাহন।
এরপর দুই বছর পর, জোহান রেবম্যান নামে আরেকজন খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক জার্মানি থেকে কেনিয়ায় আসেন। কেনিয়ার ইতিহাসে প্রথম খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক এরাই। এরা দুজন শত শত মানুষকে খ্রিস্টান বানানো শুরু করেন এবং শত শত মুসলমানকে মুরতাদ বানিয়ে ফেলেন।
আপনারা অনেকেই হয়তো বিস্মিত হয়েছেন—আমি কীভাবে আড়াই বছরের সন্তানকে দেশে রেখে আহলিয়া সহ দুই মাসের জন্য দাওয়াতের সফরে বের হলাম? কিন্তু এবার আমি আপনাদেরই একটি প্রশ্ন করি—আপনারা কি জানেন, সেই জোহান রেবম্যান কত বছর কেনিয়াতে দাওয়াতের কাজে কাটিয়েছেন? এই প্রশ্নটা আমি কেনিয়ার কান্ট্রি মার্কাজ নাইরোবিতে বয়ানের সময়ও করেছিলাম, জেলা মার্কাজ মার্সাবিতে বয়ানের সময়ও করেছিলাম।
উন্নত দেশ জার্মানি থেকে, সকল সুযোগ-সুবিধা ত্যাগ করে, কেনিয়ার মতো দরিদ্র রাষ্ট্রে তিনি কতটা সময় কাটিয়েছেন আন্দাজ করতে পারেন?
এক দিন নয়, দুই দিন নয়; এক বছর নয়, দুই বছরও নয়—পুরো ২৯ বছর তিনি এই মিশনে কাটিয়েছেন!
দরিদ্র দেশগুলোর সবচেয়ে বড় অভাব দুটি বিষয়ে—এক, শিক্ষা; দুই, সেবা। এই দুটি ক্ষেত্রকেই বিশ্বের খ্রিস্টানরা বেছে নিয়েছে তাদের ধর্ম প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে। যেই আখলাক, নৈতিকতা, ও সহমর্মিতা একদিন রাসূল (সা.) আমাদের শিখিয়েছিলেন—আজ সেটাই তারা নিজেদের মাঝে ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে।
কেনিয়াও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশের সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট হাসপাতালের সংখ্যা ১২০০টি, যার মধ্যে খ্রিস্টান মিশনারিদের পরিচালিত হাসপাতাল ৯০০টি।
আর শিক্ষার ক্ষেত্রে? কেনিয়ায় মোট স্কুলের সংখ্যা প্রায় ৪০,০০০। তার মধ্যে প্রায় ২৫,০০০টি—অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি—খ্রিস্টান মিশনারিদের পরিচালিত।
আমি দাওয়াতের সময় বহু খ্রিস্টান ভাইকে জিজ্ঞেস করেছি—ব্রিটিশরা এই দেশ শাসন করেছে, যেমন তারা আমাদের উপমহাদেশও শাসন করেছিল। তারা শোষণ করেছে, নিপীড়ন করেছে—তারপর একদিন বিদায়ও নিয়েছে। কিন্তু আজ, সেই একই জাতির উত্তরসূরিরা এসেছে শিক্ষা ও সেবার নামে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে—তাদের উদ্দেশ্য কী? তারা কি নিঃস্বার্থভাবে আমাদের সন্তানদের শিক্ষিত করে তুলছে? না কি এর পেছনে আছে অন্য কোনো উদ্দেশ্য?
উত্তরটা খুব স্পষ্ট—তাদের মূল লক্ষ্য, আমাদের সন্তানদের ধর্মান্তরিত করা।
এরই ধারাবাহিকতায়, ধীরে ধীরে বিভিন্ন দেশ থেকে আরও শত শত খ্রিস্টান মিশনারি আসতে থাকে কেনিয়ায়, শুধুমাত্র ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে। সময়ের প্রবাহে তাদের সেই প্রচেষ্টা এমন এক অবস্থানে পৌঁছায় যে, ২০২৫ সাল নাগাদ কেনিয়ায় চার্চের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬০,০০০-এ!
ভাবতে পারেন? যেখানে পুরো দেশে মসজিদের সংখ্যা মাত্র ৪,০০০, সেখানে চার্চের সংখ্যা ষাট হাজার! অর্থাৎ, কেনিয়ার প্রায় প্রতিটি গলিতে গলিতে খ্রিস্টান গির্জা।
আমরা দাওয়াত দেওয়ার সময় বহু মানুষকে পেয়েছি, যাদের মুখেই শুনেছি—“আমার দাদা ছিলেন মুসলমান।” কিন্তু আজ তারা খ্রিস্টান। কীভাবে? মিশনারিদের প্রভাবেই তারা ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছে।
আপনারা কি জানেন, কেনিয়ার বর্তমান জনসংখ্যা কত? মোট মুসলিম কত? খ্রিস্টান কত? শুনলে আপনি সত্যিই চমকে যাবেন।
এই মুহূর্তে কেনিয়ার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৫ কোটি। এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ খ্রিস্টান। মুসলমান মাত্র ১০ শতাংশ।
অর্থাৎ, পুরো দেশে মুসলমান মাত্র ৫০ লক্ষ, আর খ্রিস্টান প্রায় সাড়ে চার কোটি!
শূন্য থেকে শুরু করে এই সংখ্যা গড়ে তুলতে খ্রিস্টান মিশনারিদের লেগেছে মাত্র ১৮০ বছর!
আপনি হয়তো ভাবছেন, ঘটনা শুধু কেনিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। না, আরও অবাক হবেন—এই দৃশ্যপট শুধু কেনিয়ায় নয়, বরং আশপাশের আরও অনেক আফ্রিকান রাষ্ট্রেই হুবহু একইভাবে দেখা যায়। যেমন: কঙ্গো: জনসংখ্যা ১০ কোটি ২০ লক্ষ; এর মধ্যে ৯৫% খ্রিস্টান
আঙ্গোলা: ৩ কোটি ৬০ লক্ষ; ৯৪% খ্রিস্টান, মাত্র ৫% মুসলিম
রুয়ান্ডা: ১ কোটি ৪০ লক্ষ; ৯৩% খ্রিস্টান, মাত্র ২% মুসলিম
মালাউই: ২ কোটি ১০ লক্ষ; ৮৫% খ্রিস্টান, ১৩% মুসলিম
উগান্ডা: ৪ কোটি ৮০ লক্ষ; ৮৪% খ্রিস্টান, ১৪% মুসলিম
আর যখন আমরা নিজেদের ভেতর ব্যস্ত ছিলাম—গোল টুপি পড়বো না লম্বা টুপি, হাত বুকে রাখবো না নাভিতে—এসব নিয়ে আন্দোলন করছিলাম, বিতর্কে মশগুল ছিলাম, তখন ঠিক সেই সময়েই আমাদের লক্ষ লক্ষ ভাইবোনকে তারা ধীরে ধীরে জাহান্নামের পথে টেনে নিয়ে গেছে।
ও হ্যাঁ, আরেকটি দেশের কথাই বলা হয়নি—সুদান ও দক্ষিণ সুদান। এক সময়ে এরা ছিল একই রাষ্ট্র। কিন্তু দক্ষিণ সুদানের অধিকাংশ মানুষ খ্রিস্টান হয়ে যাওয়ার পর, তারা নিজস্ব একটি রাষ্ট্র ঘোষণা করে আলাদা হয়ে যায়। এই ঘটনাটি শুধু ইতিহাস নয়, আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
আসলে, এত দূরে যাওয়ারও দরকার নেই। আজ যদি আপনি পার্বত্য চট্টগ্রামে যান, দেখবেন একই চিত্র ধীরে ধীরে আমাদের সামনে খুলে যাচ্ছে। সাজেকে ঢুকতেই চোখে পড়বে বিশাল একটি চার্চ। যাদের আমরা একসময় চিনতাম চাকমা, মারমা বা অন্য কোনো উপজাতি নামে—আজ তাদের সবাই খ্রিস্টান। বিশ্বাস না হলে গিয়ে জিজ্ঞাসা করবেন। বান্দরবনেও একই অবস্থা।
আমরা যদি আজ দাওয়াতি কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিই, তবে যে পরিবর্তন দক্ষিণ সুদানে ঘটেছে—আমাদের দেশেও তা ঘটতে খুব বেশি সময় লাগবে না। বাস্তবতা এমনই নির্মম।
আর হ্যাঁ, যারা আগের পর্বে ভেবেছিলেন কত মানুষ মুসলাম হয়েছে!
তাদের জন্য সামান্য একটা খবরে ফিরে আসি।
আমাদের দুই মাসের দাওয়াতে কেনিয়াতে মুসলিম হয়েছিল মাত্র ২২৪ জন ।
এবার একটু হিসাব করা যাক—
যতজন খ্রিষ্টান এখনও মুসলমান হয়নি তাদের সংখ্যা:
৪,৫০,০০,০০০ - ২২৪ = ৪,৪৯,৯৯,৯৭৬ জন।
এখন প্রশ্ন—এই সংখ্যাটি মোট জনসংখ্যার কত শতাংশ?
২২৪/৪,৫০,০০,০০০*১০০=0.0005%
হ্যাঁ, মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য পাঁচ শতাংশ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে।
তবু তো সত্যিই—বিন্দু বিন্দু জলেই একদিন সাগর হয়।
আমাদের চেষ্টা হয়তো এখনও সামান্য, কিন্তু আল্লাহর নিকট কবুল হলে এই সামান্যই একদিন অগণন প্রাণের হেদায়াতের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আপনাদের আরেকটি সুসংবাদ জানাই—আফ্রিকা থেকে ফিরে আসার আগেই IOM এর একটি শাখা আফ্রিকায় চালু করা হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ।
সুবহানাল্লাহ! আফ্রিকার জন্য কোর্সগুলো সম্পূর্ণ ফ্রি করে দেওয়া হয়েছে। এবং নিয়ত করা হয়েছে ওখানকার কোর্স ফ্রি থাকবে। যেখানে খ্রিষ্টান মিশনারীরা কোটি কোটি টাকা ওখানে ইনভেস্ট করেছে আমাদের এই সামান্য ইনভেস্ট তাদের তূলনায় কিছুই না।
প্রথম কোর্স হিসেবে শুরু হয়েছে কোরআনের তাজবীদ এবং কমপারেটিভ রিলিজিওন নামে।
লক্ষ্য একটাই—আফ্রিকার মাটিতেই কিছু মেধাবী, নিবেদিতপ্রাণ দায়ী তৈরি করা, যারা নিজেদের দেশেই সত্যের দাওয়াত ছড়িয়ে দেবে।
আলহামদুলিল্লাহ! এখন পর্যন্ত ৩৪২ জন ভাই-বোন এই কোর্সের জন্য ফর্ম পূরণ করেছেন।
এদের মধ্যে আছেন কেনিয়া, ইথিওপিয়া, তানজানিয়া ও সুদানসহ আরও কিছু দেশের শিক্ষার্থীরা।
ক্লাস ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে এবং আলহামদুলিল্লাহ, প্রায় এক মাস ধরে নিয়মিত ক্লাস চলছে। কমপারেটিভ রিলিজিওন এর ক্লাস চেষ্টা করছি আমি নিজেই নেওয়া জন্য …
Class 01: https://youtu.be/_jqjZGQ4FhI
Class 03: https://youtu.be/6A5xJYVsxm0
আমি এত কষ্ট করে এই সফরনামার পর্বগুলো লিখছি—এর একটাই উদ্দেশ্য: যদি সামান্য হলেও আমাদের সবার মধ্যে উম্মতের দরদ ও ভালোবাসা জেগে ওঠে।
আমরা যারা সরাসরি আফ্রিকার মাটিতে গিয়ে দাওয়াত দিতে পারি না, অন্তত এই মুহূর্তে আমাদের একটুখানি কিছু করা তো সম্ভব?
চলুন, অন্তত একটা ছোট আমল শুরু করি।
আফ্রিকার ৫৪টি দেশের জন্য, আজ থেকেই আমরা প্রতিদিন এশার নামাজের পর ২ রাকাত নফল নামাজ পড়ি। একেক দিন একেক দেশের জন্য। একেক দিন একেক জাতির হেদায়াতের জন্য দোয়া করি। ৫৪ দিনে একবার পুরো আফ্রিকা কভার হবে। ইনশাআল্লাহ।
আপনি যে দেশটিতে যেতে পারেননি, হয়তো আল্লাহ এই ছোট্ট আমলটির মাধ্যমে সেই দাওয়াতকেই কবুল করে নেবেন আপনার নামে।
হয়তো কোনো এক অদৃশ্য মেহেরবানিতে, সেই দেশটির কেউ একদিন আপনারই করা দোয়ার বরকতে ইসলাম গ্রহণ করবে। যারা যারা এই আমল শুরু করার নিয়ত করছেন, তারা কমেন্ট করে জানাতে পারেন ইনশাআল্লাহ।
এটা শুধু আপনার নাম লিখে যাওয়া নয়—উম্মতের জন্য, আফ্রিকার জন্য, এক ব্যথিত হৃদয়ের দায়িত্বশীল প্রতিশ্রুতি।
(১ম পর্ব: https://misc.iom.edu.bd/mobileapps/Marsus-EduVerse/blog/africa )
(২য় পর্ব https://misc.iom.edu.bd/mobileapps/Marsus-EduVerse/blog/africa-sofor )